দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার ভিসা (D-2/D-4): ২০২৫ সালের নতুন নিয়মে সম্পূর্ণ গাইডলাইন


 

Study in Korea from Bangladesh

দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার ভিসা (D-2/D-4): ২০২৫ সালের নতুন নিয়মে সম্পূর্ণ গাইডলাইন

দক্ষিণ কোরিয়া, তার উন্নত প্রযুক্তি, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য সমাদৃত। প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা অথবা কোরিয়ান ভাষা শেখার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমায়। তবে, অনেক সময় ভিসা আবেদনের জটিল প্রক্রিয়া এই স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ২০২৫ সালের ৪ মে থেকে দক্ষিণ কোরিয়ান স্টুডেন্ট ভিসা (D-2 এবং D-4) আবেদন প্রক্রিয়াতে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন! এই ব্লগে আমরা নতুন নিয়মে কোরিয়ান স্টুডেন্ট ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদন সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য আলোচনা করব।

বড় পরিবর্তন: এখন থেকে বাধ্যতামূলক ই-ফর্ম!

৪ মে ২০২৫ থেকে, সকল স্টুডেন্ট ভিসা আবেদনকারীকে অবশ্যই Korea Visa Portal ওয়েবসাইটে গিয়ে অনলাইন ই-ফর্ম পূরণ করতে হবে। এর মানে হলো, কনস্যুলার সেকশনে হাতে লেখা বা ফিজিক্যাল আবেদন ফর্ম জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। একমাত্র ই-ফর্মের মাধ্যমে আপনার আবেদন জমা দিতে হবে, এবং সেই ফর্মটি প্রিন্ট করে বারকোডসহ কোরিয়ান দূতাবাসে জমা দিতে হবে।

ভিসা আবেদনের সম্পূর্ণ ধাপ (Step-by-Step Procedure)

১. অনলাইন আবেদন

প্রথমেই Korea Visa Portal এ একাউন্ট খুলুন এবং ই-ফর্ম পূরণ করুন। এই ফর্মটি সঠিক তথ্য দিয়ে সাবমিট করতে হবে।

২. প্রিন্ট আউট

ই-ফর্ম জমা দেওয়ার পর সেটি একটি ইউনিক বারকোডসহ প্রিন্ট করুন। বারকোড সহ এই প্রিন্টকৃত ফর্মটি আপনার মূল আবেদনপত্র হবে।

৩. কাগজপত্র সংগ্রহ

এখন আপনাকে নিচে উল্লেখিত ডকুমেন্টগুলোর মূল ও নটারি করা কপিগুলো প্রস্তুত করতে হবে।

৪. শারীরিক উপস্থিতি

প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আপনাকে নিজে কোরিয়ান দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে আবেদন জমা দিতে হবে।

৫. জমা দেওয়া

এখন নির্ধারিত ফি এবং সমস্ত কাগজপত্রসহ বারকোডযুক্ত ফর্মটি ঢাকাস্থ কোরিয়ান দূতাবাসে জমা দিন।

গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক টার্ম শুরুর অন্তত ৫ (পাঁচ) কার্যদিবস আগে ভিসা আবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রক্রিয়াকরণের সময় এবং যাতায়াতের বিষয়টি মাথায় রেখে আপনি আবেদন প্রক্রিয়া আগেই শুরু করুন।


ডকুমেন্ট চেকলিস্ট: যা যা লাগবে অবশ্যই

সাধারণ/বেসিক ডকুমেন্টস (সবার জন্য)

  1. ভিসা আবেদন ফর্ম: বারকোডসহ প্রিন্টকৃত ই-ফর্ম। আবেদনপত্রে কোন তথ্য বাদ দেবেন না।

  2. ছবি: সাদা পোশাকে, সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে তোলা ৩.৫ সেমি x ৪.৫ সেমি সাইজের রঙিন পাসপোর্ট ছবি (সর্বশেষ ৬ মাসের মধ্যে তোলা)।

  3. পাসপোর্ট (মূল কপি): যার মেয়াদ অন্তত ৬ মাস অবশিষ্ট থাকতে হবে।

  4. পাসপোর্টের ফটোকপি: প্রথম পাতার ফটোকপি।

  5. কাভার লেটার: আবেদনকারীর নিজের লেখা একটি ফরওয়ার্ডিং বা কাভার লেটার।

স্টুডেন্ট ভিসার জন্য বিশেষ ডকুমেন্টস (D-2 এবং D-4 উভয়ের জন্য)

  1. ভর্তির স্বীকৃতিপত্র (Admission Related):

    • বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ইস্যুকৃত অ্যাডমিশন সার্টিফিকেট (মূল বা কপি)।

    • অফার লেটার।

    • টিউশন ফি প্রদানের সার্টিফিকেট।

  2. ব্যক্তিগত তথ্য:

    • জন্ম নিবন্ধন সনদ (মূল ও কপি)।

    • পারিবারিক বন্ধন সনদ (Family Relationship Certificate): সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন কার্যালয় থেকে ইস্যুকৃত (৩ মাসের মধ্যে)।

    • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট (PCC): বাংলাদেশ পুলিশ থেকে ইস্যুকৃত (৩ মাসের মধ্যে)।

  3. আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ):

    • ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট।

    • গত ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট।

    • আয়ের উৎসের প্রমাণ: গ্যারান্টরের (প্রধানত পিতামাতা) চাকরির সার্টিফিকেট বা ট্রেড লাইসেন্স (প্রাথমিক ও বর্তমান)।

    • ট্যাক্স সার্টিফিকেট, গত ২ বছরের ট্যাক্স রিটার্ন এবং ট্যাক্স চালানের কপি।

    • সম্পত্তির দলিল (যদি জমা দেওয়া হয়) এর মূল ও নিবন্ধিত কপি।

  4. শিক্ষাগত যোগ্যতার কাগজপত্র:

    • এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতকসহ সকল সনদ ও মার্কশিটের মূল এবং ফটোকপি।

    • এই কাগজপত্রগুলোর কপিগুলো অবশ্যই বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নটারি করা থাকতে হবে (৩ মাসের মধ্যে)।

    খুব গুরুত্বপূর্ণ: এখন থেকে এই ডকুমেন্টগুলো আর কোরিয়ান দূতাবাস থেকে অ্যাটেস্টেশন করার প্রয়োজন নেই।

  5. অন্যান্য আবশ্যিক কাগজ:

    • পিতামাতার নো-অবজেকশন লেটার (NOC): পড়াশোনা ও বিদেশে থাকার ব্যাপারে সম্মতিপত্র। নোটারাইজড করার দরকার নেই।

    • পিতামাতার জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট (যদি থাকে) এর ফটোকপি।

    • টিবি (যক্ষ্মা) টেস্ট রিপোর্ট: কোরিয়ান দূতাবাস কর্তৃক মনোনীত হাসপাতাল/কেন্দ্র থেকে করতে হবে (৩ মাসের মধ্যে)।

    • ইংরেজি ভাষার দক্ষতার সার্টিফিকেট: টোফেল বা আইইএলটিএস (২ বছরের মধ্যে ইস্যুকৃত)।

    • বিমান টিকিটের বুকিং স্লিপ।


ভিসা ফি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

  • ৯০ দিনের বেশি থাকার জন্য স্টুডেন্ট ভিসা ফি: ৬০ মার্কিন ডলার (সিঙ্গল এন্ট্রি)।

  • ফি ফেরতযোগ্য নয়: ভিসা না পেলে, আবেদন নিজে বাতিল করলে, বা মাল্টিপল এন্ট্রির জন্য আবেদন করে সিঙ্গল এন্ট্রি ভিসা পেলেও ফি ফেরত দেওয়া হয় না।


শেষ কথা: সুন্দরভাবে প্রস্তুতি নিন

ভিসা আবেদন একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। সবচেয়ে বড় ভুল হয় হাতে লেখা ফর্ম জমা দিয়ে বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে দূতাবাসে যাওয়া। নতুন ই-ফর্ম পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ ও দ্রুতগতি আনবে বলে আশা করা যায়। তাই সময় হাতে রেখে, ধৈর্য ধরে এবং সম্পূর্ণ তালিকা চেক করে সব কাগজপত্র প্রস্তুত করুন। সঠিক প্রস্তুতি আপনাকে কোরিয়ায় পড়াশোনার স্বপ্নপূরণের একধাপ আরও কাছে নিয়ে যাবে।

সফলতার জন্য শুভকামনা!

দ্রষ্টব্য: ভিসা নিয়মাবলী সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হতে পারে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য কোরিয়া ভিসা পোর্টাল (Korea Visa Portal) এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত কোরিয়ান দূতাবাসের অফিসিয়াল নোটিশগুলো নিয়মিত চেক করুন।


No comments:

Post a Comment